কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর এলাকায় এক পাঁচ বছরের শিশু মুস্তারীন আদ্রিতা বিড়ালের আঁচড়ের পর অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভিডিওতে শিশুটিকে বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে এবং অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা যায়। অনেকেই একে জলাতঙ্কের লক্ষণ বলে মনে করেছেন। তবে চিকিৎসক ও পরিবারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের কোনো লক্ষণ নেই। বরং এটি মানসিক চাপ ও প্যানিক অ্যাটাকজনিত আচরণ।
আদ্রিতা ‘মিউ মিউ’ শব্দ বিড়াল এর মতো আচরণ করছে কেন?
শিশুটির নাম মুস্তারীন আদ্রিতা। সে ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর এলাকার বাসিন্দা ও একজন ব্যাংকার সাব্বিরের মেয়ে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, বাড়িতে শখ করে দুটি পোষা বিড়াল রাখা হয়েছিল। গত কয়েক মাস আগে সেই বিড়ালগুলো হঠাৎ করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকেই শিশুটির মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও অস্থিরতা দেখা যায়। পরে একটি বিড়াল তাকে আঁচড় মারে। আঁচড়ের পর শিশুটির আচরণে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
গত ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় শিশুটির বাবা-মা তাকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। তখন শিশুটি বিড়ালের মতো শব্দ করছিল এবং বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয় এবং জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকা (র্যাবিস ভ্যাকসিন) প্রদান করে। হাসপাতালের দুই কর্মকর্তা ওই সময় ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি পোষা বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্ত হয়েছে এবং আগেও তাকে র্যাবিস টিকা দেওয়া হয়েছিল।
ভিডিওটি প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ২০ আগস্টের দিকে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস টুডে’সহ কয়েকটি পেজে ভিডিওটি প্রকাশিত হয়। ভিডিওতে শিশুটিকে স্পষ্টভাবে ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে শোনা যায়। ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তির কণ্ঠে শোনা যায়, “এটি দেখে জলাতঙ্ক মনে হচ্ছে। এর চিকিৎসা কুষ্টিয়ায় নেই। রাজশাহীতে নিতে হবে।” ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় দুই কোটিরও বেশিবার দেখা হয়। চ্যানেল আই, এশিয়া পোস্ট, ভোরের কাগজসহ আরও কয়েকটি গণমাধ্যমও ভিডিওটি প্রচার করে।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ও বিতর্ক শুরু হয়। কেউ কেউ একে জলাতঙ্ক বলে দাবি করেন, আবার কেউ বলেন এটি নাটক বা ভিউ পাওয়ার জন্য তৈরি। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, বিড়ালের আঁচড়ে কি সত্যিই কোনো শিশুর কণ্ঠস্বর বা আচরণ এভাবে পরিবর্তন হতে পারে?
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইকবাল হোসেন ২২ আগস্ট সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, “বিড়ালের আঁচড়ের পর শিশুটিকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে শিশুটির মধ্যে জলাতঙ্কের কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।”
ডা. ইকবাল আরও বলেন, “‘মিউ মিউ’ শব্দ করা বা অস্বাভাবিক আচরণ জলাতঙ্কের কারণে হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভয় বা মানসিক চাপের কারণেও শিশুর এমন আচরণ হতে পারে।”
চিকিৎসকদের মতে, জলাতঙ্ক হলে সাধারণত হাইড্রোফোবিয়া (পানিভীতি), অ্যারোফোবিয়া, পেশিতে খিঁচুনি, অতিরিক্ত লালা ঝরা, আক্রমণাত্মক আচরণ ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। কিন্তু এই শিশুর ক্ষেত্রে সেসব লক্ষণ ছিল না। বরং শিশুটির আচরণকে মানসিক চাপ বা প্যানিক অ্যাটাকের সঙ্গেই মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান, এটি জলাতঙ্ক নয়। শিশুটির প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। বর্তমানে সেই অনুযায়ীই তার চিকিৎসা চলছে।
শিশুর মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি জানান, “কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল থেকে আমাদের ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়। এখানে চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানান, এটি জলাতঙ্ক নয়, মেয়ের প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। বর্তমানে সেই অনুযায়ীই তার চিকিৎসা চলছে। তবে তার কাশি কিছুটা বেশি।”
মা আরও বলেন, “আমার মেয়ে গত দুই বছর ধরে ঠান্ডা ও অ্যাজমার সমস্যায় ভুগছে। কুষ্টিয়ায় একজন চিকিৎসকের অধীনে দীর্ঘদিন ধরে তার চিকিৎসা চলছে। ঠান্ডাজনিত সমস্যার কারণে মাঝেমধ্যেই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।”
তিনি জানান, বাসায় দুটি পোষা বিড়াল ছিল। সেগুলো হঠাৎ করে চলে যাওয়ার পর মেয়ের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরে বিড়ালের আঁচড়ের ঘটনা ঘটলে সেই ভয় আরও বেড়ে যায়। ফলে তার প্যানিক অ্যাটাক হয় বলে পরিবার মনে করছে।
শিশুর মামা মো. আলিফ রহমান ২২ আগস্ট এক ফেসবুক পোস্টে জানান, শিশুটি আগের থেকে অনেকটা সুস্থ হয়েছে। পোস্টের সঙ্গে সংযুক্ত ভিডিওতে শিশুটিকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায়। তিনি লেখেন, “যারা এই ভিডিওটা নিয়ে লেখালেখি করছেন বা হাসাহাসি করছেন, এগুলো আসলে আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর। আপনারা না জেনে শুনে আজেবাজে কমেন্ট করবেন না।”
স্থানীয় বাসিন্দা হেলাল মজুমদার বলেন, “আমাদের এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে, আমরা জানতামই না। ভিডিওটি দেখার পর জানতে পেরেছি। ভুক্তভোগী পরিবারের কেউই এখন বাড়িতে নেই। বর্তমানে আদ্রিতা ঢাকায় চিকিৎসাধীন।”
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। তারা বলেন, বিড়ালের আঁচড় থেকে ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (Bartonella henselae ব্যাকটেরিয়া) হতে পারে। এতে জ্বর, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, ক্লান্তি ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়ে ‘মিউ মিউ’ শব্দ করা বা বিড়ালের মতো আচরণ করা জলাতঙ্ক বা ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজের লক্ষণ নয়।
ইউনিসেফ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সূত্র অনুসারে, তীব্র ভয় বা মানসিক আঘাতের মুহূর্তে শিশুদের মধ্যে ডিসোসিয়েশন (বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া) হতে পারে। এতে শিশু অবচেতনভাবে কোনো প্রাণীর ডাক বা আচরণ অনুকরণ করতে পারে। প্যানিক অ্যাটাকের সময় দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, গলার মাংসপেশি সংকুচিত হওয়া এবং অদ্ভুত শব্দ বের হওয়াও সম্ভব।
কিছু চিকিৎসক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেছেন যে, এই ধরনের ভিডিও দেখে সরাসরি জলাতঙ্ক বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। জলাতঙ্ক হলে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই লক্ষণগুলো আরও তীব্র হয় এবং রোগী সাধারণত বাঁচে না। কিন্তু এই শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসা চলছে এবং সে ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছে।
ঘটনাটি নিয়ে রিউমর স্ক্যানারসহ কয়েকটি ফ্যাক্ট-চেকিং সংগঠন তদন্ত চালিয়েছে। তারা নিশ্চিত করেছে যে, শিশুটিকে ১৭ আগস্ট কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে ঢাকায় পাঠানো হয়। চিকিৎসকদের মতে এটি প্যানিক অ্যাটাক।
বর্তমানে শিশুটি ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার মা জানিয়েছেন, বুকের এক্স-রে পরীক্ষা করা হয়েছে। রিপোর্ট ভালো এলে এক-দুই দিনের মধ্যে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হতে পারে।
এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো—পোষা প্রাণীর আঁচড় বা কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। ছোটখাটো ভয় বা আঘাত থেকেও শিশুদের মধ্যে গুরুতর মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ভিডিও দেখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে তথ্য যাচাই করা উচিত।
কুষ্টিয়ার এই শিশুর ঘটনা একদিকে যেমন উদ্বেগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোরও সুযোগ তৈরি করেছে। পরিবার ও চিকিৎসকদের দাবি অনুযায়ী শিশুটি এখন সুস্থ হওয়ার পথে। আশা করা যাচ্ছে, সে দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।
আরও জানুন
পিংক বাস নারী চালক: প্রশিক্ষণের পাশাপাশি অভিজ্ঞতা কতটা জরুরি?




