নিজস্ব প্রতিবেদন |ইকবাল হোসাইন |লক্ষীপুর
প্রকাশিত হয়েছে ২আগস্ট ১০:৫৬ পি,এম
জিনের নির্দেশ’ পাওয়ার দাবি
জামালপুর মেলান্দহ উপজেলায় দাফনের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর এক বৃদ্ধার মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের দাবি, মৃত নারীর ছেলে ও মেয়েকে ‘জিনে আসর’ করায় তারা বিশ্বাস করেন যে বৃদ্ধা এখনও জীবিত আছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিনের নির্দেশেই কবর খুঁড়ে মরদেহ উত্তোলন করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
শনিবার (১ আগস্ট) রাতে উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল, আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
দাফনের কয়েক ঘণ্টা পরই শুরু হয় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অসুস্থতাজনিত কারণে ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হলে শনিবার সকাল ৮টার দিকে গ্রামের একটি কবরস্থানে ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী তাকে দাফন করা হয়। দাফনের সময় স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।
সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই সম্পন্ন হলেও দাফনের কয়েক ঘণ্টা পর পরিবারের কয়েকজন সদস্যের আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে মৃত নারীর ছেলে ও মেয়ে দাবি করেন, তারা এমন কিছু অনুভব করছেন যা তাদের বিশ্বাস করিয়েছে যে তাদের মা এখনও জীবিত রয়েছেন।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মৃত নারীর ছেলে ও মেয়ের ওপর ‘জিনে আসর’ হয়।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, মৃত নারীর ছেলে ও মেয়ের ওপর ‘জিনে আসর’ হয়। তারা বলতে থাকেন, তাদের মা মারা যাননি এবং তাকে দ্রুত কবর থেকে তুলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ নির্দেশ তারা জিনের কাছ থেকেই পেয়েছেন।
পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রথমে বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় থাকলেও পরে ওই দাবিকে বিশ্বাস করে রাতে কবর খোঁড়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করা হয়।
ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেউ কেউ পরিবারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত মরদেহ কবর থেকে তুলে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে নেওয়া হয় মরদেহ
মরদেহ উত্তোলনের পর প্রথমে মেলান্দহে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকায় পরে জামালপুর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসকেরা মরদেহ পরীক্ষা করেন। পরিবারের অনুরোধে ইসিজিসহ প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা করা হয়। তবে পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন যে বৃদ্ধার মৃত্যু আগেই হয়েছে এবং তার শরীরে জীবনের কোনো লক্ষণ নেই।
চিকিৎসকদের এ ঘোষণার পর পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি পুনরায় বাড়িতে নিয়ে আসেন।
চিকিৎসক ও পরিবারের নীরবতা
ঘটনার বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। হাসপাতালে দায়িত্বরত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরাও বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
এ কারণে পুরো ঘটনার পেছনের বিস্তারিত তথ্য বা পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য
ঘটনার খবর দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন এবং বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এমন ঘটনার নজির আগে কখনও দেখেননি বলে জানান।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, কুসংস্কার বা অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, প্রিয়জনকে হারানোর মানসিক আঘাত থেকেও পরিবারের সদস্যরা এমন আচরণ করে থাকতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা
ঘটনার ছবি ও বিভিন্ন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ এ ঘটনাকে কুসংস্কারের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, আবার কেউ পরিবারের মানসিক অবস্থার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, এমন পরিস্থিতিতে গুজব বা যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য ছড়িয়ে না দিয়ে সচেতন থাকা জরুরি। অন্যদিকে কেউ কেউ চিকিৎসকদের দ্রুত পদক্ষেপের প্রশংসা করেন।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে
মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যু অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের গভীর মানসিক আঘাতের মধ্যে ফেলে। এমন অবস্থায় তারা বাস্তবতা মেনে নিতে না পেরে বিভিন্ন বিশ্বাস বা ধারণার ওপর নির্ভর করতে পারেন।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবারকে মানসিক সহায়তা দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বলে তারা মনে করেন।
আইন ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোনো মরদেহ দাফনের পর তা উত্তোলনের ক্ষেত্রে সাধারণত আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ কোনো তদন্ত, আদালতের নির্দেশ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
তবে এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, ঘটনাটির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। পাশাপাশি কুসংস্কার ও গুজব সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর পুরো নয়াপাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় এ বিষয়টি এখনও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে নানা মতামত ও বিশ্লেষণ অব্যাহত রয়েছে।
ঘটনার বিষয়ে প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে জানানো হবে।
আমাদের অফিসিয়াল ইউটিউব ফলো রাখুন



