প্রকাশিত: August 2026, 11:07 PM
প্রতিবেদক: নোমান উদ্দিন|ঢাকা
রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উদ্যোগে চালু হয়েছে বিশেষ ‘পিংক বাস’ বা মহিলা বাস সার্ভিস। নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের পাশাপাশি পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানোই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীদের দায়িত্ব দেওয়াকে অনেকেই নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে সার্ভিস চালুর পর রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায় একটি দোতলা বাস ফ্লাইওভারে ওঠার সময় তৈরি হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯ আগস্ট একটি নারীচালিত দোতলা পিংক বাস ফ্লাইওভারে ওঠার সময় সমস্যায় পড়ে। পরে একজন পুরুষ চালক সহায়তায় এগিয়ে আসেন এবং বাসটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ নারী চালকদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার অনেকে মনে করছেন, একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সব নারী চালকের দক্ষতা বিচার করা ঠিক নয়। এর মধ্যেই সংশ্লিষ্ট নারী চালকের বক্তব্য নিয়েও ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি বাসটি ফ্লাইওভারে তুলতে ব্যর্থ হয়ে চালকের আসন ছাড়েননি; বরং পানি পান করার জন্য নামার সময় গাইড বাসটির নিয়ন্ত্রণ নেন। ফলে ঘটনাটির প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বিষয়টি নারী-পুরুষের সক্ষমতার লড়াই নয়
একজন চালক গাড়ি চালাতে গিয়ে কোনো পরিস্থিতিতে সমস্যায় পড়তেই পারেন। গাড়ির ধরন, রাস্তার ঢাল, যানজট, ট্রাফিক পরিস্থিতি, গাড়ির যান্ত্রিক অবস্থা এবং চালকের অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়েই একটি বড় যান নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা তৈরি হয়।
তাই কোনো নারী চালক একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সমস্যায় পড়েছেন বলেই নারীরা বাস চালাতে পারবেন না—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি একজন নারী চালককে শুধু নারী হওয়ার কারণে অযোগ্য মনে করাও অন্যায়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, একজন নতুন চালককে কীভাবে ধাপে ধাপে বড় যানবাহন চালানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বাস্তব সড়কের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাকে কতটা সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বড় বাস চালানোর দক্ষতা শুধু প্রশিক্ষণে আসে না
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিভিন্ন শ্রেণিতে যানবাহনের ওজন অনুযায়ী আলাদা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত রয়েছে। পেশাদার মধ্যম শ্রেণির লাইসেন্সের ক্ষেত্রে পেশাদার হালকা লাইসেন্স ব্যবহারের অন্তত তিন বছরের শর্ত রয়েছে। ভারী শ্রেণিতে যেতে পেশাদার মধ্যম লাইসেন্স ব্যবহারেরও অন্তত তিন বছরের শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ বড় যান চালানোর দক্ষতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শুধু প্রশিক্ষণ শেষ করাই যথেষ্ট নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন চালককে ধীরে ধীরে ছোট যান থেকে বড় যান, সহজ সড়ক থেকে ব্যস্ত সড়ক এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি থেকে জটিল ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত করা হলে দক্ষতা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ থাকে।
এই জায়গাতেই নারী বাস সার্ভিস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠতে পারে—প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী চালকদের সরাসরি দোতলা বাসের মতো বড় যান নিয়ে ঢাকার অত্যন্ত ব্যস্ত সড়কে দায়িত্ব দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।
ঢাকা শহরের রাস্তা কেন আলাদা চ্যালেঞ্জ?
বিমান বা মেট্রোরেল পরিচালনার সঙ্গে ঢাকার সড়কে একটি বড় বাস চালানোর তুলনা পুরোপুরি এক নয়। বিমান নির্দিষ্ট আকাশপথ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে পরিচালিত হয়। মেট্রোরেলও নির্ধারিত ট্র্যাক অনুসরণ করে। সেখানে বিপরীত দিক থেকে আসা শত শত গাড়িকে পাশ কাটিয়ে চলার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু ঢাকার সড়কে একজন বাস চালককে একই সঙ্গে অসংখ্য ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা, সিএনজি ও পথচারীর গতিবিধি বিবেচনায় রাখতে হয়। কোথাও হঠাৎ গাড়ি থেমে যেতে পারে, কোথাও রাস্তা সংকুচিত হতে পারে, আবার কোথাও সামনে থাকা যানবাহন মুহূর্তের মধ্যে লেন পরিবর্তন করতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফ্লাইওভারের ঢাল, মোড়, ব্যস্ত ইন্টারসেকশন এবং যানজট। একটি দোতলা বাসের আকার ও ওজন সাধারণ ছোট গাড়ির তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে চালকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নারী চালকদের জন্য সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন
নারীদের পরিবহন খাতে যুক্ত করার উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতকে পুরুষপ্রধান হিসেবে দেখা হলেও নারীরা বিভিন্ন পেশায় নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন। তাই বাস চালানোর ক্ষেত্রেও নারীদের জন্য সুযোগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই স্বাগত জানানোর মতো বিষয়।
তবে সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
প্রথম ধাপে ছোট বা তুলনামূলক সহজ যানবাহনে বাস্তব অভিজ্ঞতা, এরপর মাঝারি আকারের বাস এবং পর্যায়ক্রমে বড় ও দোতলা বাস চালানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ফ্লাইওভার, ব্যস্ত মোড়, ঘন যানজট ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ চালু করা যেতে পারে।
এতে নারী চালকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমবে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তাও আরও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একটি ঘটনার দায় পুরো উদ্যোগের নয়
পিংক বাসকে ঘিরে যে ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেটিকে কেন্দ্র করে পুরো নারী বাস সার্ভিসকে ব্যর্থ ঘোষণা করা উচিত নয়। কারণ নতুন কোনো কর্মসূচি চালুর পর বাস্তব পরিস্থিতিতে কিছু সীমাবদ্ধতা সামনে আসতেই পারে। সেই সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়াই একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনার কাজ।
বরং এই ঘটনাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে বিআরটিসি চাইলে চালকদের আরও বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিতে পারে। প্রতিটি রুটের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে চালকদের আগে থেকেই সেই পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত করা যেতে পারে।
যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন চালক নারী বা পুরুষ—পরিচয় যাই হোক না কেন, তার হাতে থাকা গাড়িতে বহু মানুষের জীবন নির্ভর করে। তাই চালকের দক্ষতা, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার বিষয়টি সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
নারীর ক্ষমতায়ন হোক পরিকল্পিত ব্যবস্থার মাধ্যমে
নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ শুধু একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি অংশ। তাই এই উদ্যোগকে সফল করতে হলে সমালোচনার পাশাপাশি গঠনমূলক পরামর্শও প্রয়োজন।
নারী চালকদের নিয়ে বিদ্রূপ বা অবমাননাকর মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইভাবে তাদের সক্ষমতা যাচাই না করেই অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়াও কাম্য নয়। প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা যাচাই এবং পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব বাড়ানোর মাধ্যমে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত নারী কিংবা পুরুষ—যে চালকই স্টিয়ারিংয়ে থাকুন, তিনি যেন নিরাপদে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেন।
নারীদের সামনে সুযোগের দরজা খুলে দেওয়া প্রয়োজন। তবে সেই সুযোগকে টেকসই করতে হলে প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই ‘পিংক বাস’ শুধু আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে না; এটি রাজধানীর গণপরিবহনে নারীর অংশগ্রহণের একটি সফল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
নোমান উদ্দিন/এন,এ
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর তথ্য এবং সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন।
অফিসিয়াল ফেজবুক





