জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসুদ বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে নতুন করে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় লক্ষ্মীপুর আউটার স্টেডিয়ামে জুলাই স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন হান্নান মাসুদ। এনসিপির লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার উদ্যোগে এ টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে যে প্রশ্ন তুললেন হান্নান মাসুদ
হান্নান মাসুদের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বর্তমান পদ্ধতি এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো। তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এমন একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত, যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।
তাঁর মতে, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে না। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক কাঠামো এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও সংস্কার প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বর্তমান ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি সরাসরি জনগণের গোপন ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
হান্নান মাসুদ বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও আলোচনা
এনসিপির এই নেতা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও কথা বলেন। তাঁর মতে, এই অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে হলে ৭০ অনুচ্ছেদসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও গণমুখী ও জবাবদিহিমূলক করার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, সেটি বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সংস্কার জরুরি।
তিনি বলেন, শুধু নির্বাচনের আয়োজন করলেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না। নির্বাচনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেওয়া নিয়ে আত্মসমালোচনা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানেরও সমালোচনা করেন হান্নান মাসুদ। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেও আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে।
তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ ও জনসম্পৃক্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
এনসিপি নেতা বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন কোনো একক দলের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন।
তাঁর মতে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা, মতবিনিময় ও ঐকমত্যের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নেওয়া উচিত।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ব্যাখ্যা
অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে নিজের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন হান্নান মাসুদ।
তিনি বলেন, তাঁর দৃষ্টিতে জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল তৎকালীন সরকার বা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এর সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নও জড়িত ছিল।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে এবং জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই প্রভাবের বিরুদ্ধেও মানুষের মধ্যে একটি রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হয়েছে।
ভারতের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে ভারত বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছিল। তাঁর বক্তব্যে ভারতকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের জন্য দায়ী করা হয়।
তবে এসব বক্তব্য হান্নান মাসুদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মূল্যায়নের অংশ। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং জুলাইয়ের আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পক্ষের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে।
ভারতের চাপ প্রসঙ্গেও মন্তব্য
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয় বলে মত দেন হান্নান মাসুদ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার বাংলাদেশের জনগণেরই থাকা উচিত।
ভারত ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাইরের কোনো চাপ বা হুমকি দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থামানো সম্ভব হবে না।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারণ করতে চায়।
নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি
হান্নান মাসুদের বক্তব্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারের কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তন, সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে সংস্কার।
তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রপতির পদকে আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার জন্য নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা দরকার।
সরাসরি ও গোপন ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাবের পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রপতিকে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের বাইরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ফুটবল টুর্নামেন্টে রাজনৈতিক বক্তব্য
জুলাই স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি মূলত ক্রীড়া আয়োজন হলেও সেখানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়ে বক্তব্য দেন এনসিপি নেতা হান্নান মাসুদ।
তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস ও এর পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানানো প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ ও লক্ষ্য সম্পর্কে জানতে পারে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জুলাইয়ের স্মৃতি ধরে রাখার পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যারা
এনসিপির লক্ষ্মীপুর জেলা কমিটির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট শামসুজ্জামান সোহেলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়। জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ হাসান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন, লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের লক্ষ্মীপুর জেলা আহ্বায়ক নুর মোহাম্মদ, জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামলী সুলতানা জেদনী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা ইউসুফ আল মাহমুদ।
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং ক্রীড়াপ্রেমীরা উপস্থিত ছিলেন।
সামনে সংস্কারের দাবি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারের দাবি বিভিন্ন মহল থেকে উঠে আসছে। তবে এসব সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং কোন কোন সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রয়োজন—তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি পরিবর্তন, সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা কিংবা সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কারের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
হান্নান মাসুদ তাঁর বক্তব্যে এসব পরিবর্তনের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কারের মাধ্যমে বাস্তব রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে, লক্ষ্মীপুরের এই অনুষ্ঠানে এনসিপি নেতার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সংবিধান সংস্কার, সংসদীয় কাঠামো এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে এসব সংস্কার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও জানুন
আরও খবর জানতে আমাদের অফিসিয়াল ফেজবুক




