দেশে সারের সংকট নেই দাবি কৃষিমন্ত্রীর, লক্ষ্মীপুরে সেপ্টেম্বরে ৬৬০ মে. টন নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ
দেশে সারের কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন কৃষি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি বলেছেন, কৃষকদের প্রয়োজনের তুলনায় দেশে পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। একই সঙ্গে সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট বা বিভ্রান্তি তৈরির কোনো চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কৃষিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি জানান, সরকার সার সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে এবং কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো সার পৌঁছানোর বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সংকটের প্রচার চালানো হলে তার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বরাদ্দপত্র
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখা গত ১৩ আগস্ট (২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩) এক অফিস আদেশ জারি করে সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসের চাহিদার বিপরীতে নন-ইউরিয়া সার (টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি) বরাদ্দ প্রদান করেছে।
বরাদ্দপত্রে বলা হয়েছে, বরাদ্দকৃত সার বিধি মোতাবেক সার ডিলারদের মাঝে উপজেলাভিত্তিক উপ-বরাদ্দ দিতে হবে। উপ-বরাদ্দের কপি এবং পূর্ববর্তী মাসের বেসরকারি খাতে বরাদ্দকৃত সারের এলসিডিভিক উত্তোলন ও অনুত্তোলনের তথ্য প্রেরণের জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া ডিলারদের মাসের ৭ তারিখের মধ্যে আবশ্যিকভাবে টাকা জমা দিয়ে সার উত্তোলনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রয় নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এই বরাদ্দপত্রে লক্ষ্মীপুর জেলার জন্য সেপ্টেম্বর মাসে নন-ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা ও বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬০ মেট্রিক টন। অর্থাৎ জেলায় সেপ্টেম্বর মাসে এই পরিমাণ সার সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দেশে সারের সংকট নেই জাতীয় ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা
কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, এই মজুত দিয়ে দীর্ঘ সময় চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে জাতীয় পর্যায়ের মজুত এবং স্থানীয় বাজারের বাস্তব চিত্র সবসময় এক রকম হয় না। অতীতেও সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলা হলেও কিছু এলাকায় ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ ও দাম নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। ফলে কৃষকের কাছে নির্ধারিত সময়ে এবং নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানোই সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতার আসল পরীক্ষা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু গুদামে সার মজুত থাকলেই যথেষ্ট নয়। পরিবহন, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ এবং খুচরা বাজারে বিক্রির ব্যবস্থাপনা যদি দুর্বল হয়, তাহলে কৃষকরা সমস্যায় পড়েন। এ কারণে মাঠ পর্যায়ের নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
লক্ষ্মীপুরে সারের সরবরাহ পরিস্থিতি
লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষক ও স্থানীয় সার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারের সরবরাহ সব এলাকায় সমান নয়। কিছু এলাকায় ডিলারের কাছে সার পাওয়া গেলেও সময়মতো পাওয়া নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে চাহিদা বেড়ে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহে চাপ তৈরি হয় বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
জেলার পরিচিত সার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
মেসার্স সোহেল ট্রেডার্স (লক্ষ্মীপুর সদর)
আলহাজ্ব মমিন উল্যা ট্রেডার্স (লক্ষ্মীপুর)
মেসার্স আব্দুর রহিম স্টোর (চন্দ্রগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর)
এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকরা সার সংগ্রহ করে থাকেন। তবে মৌসুমের শুরুতে চাহিদা বেড়ে গেলে সরবরাহে চাপ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সারের ডিলার ও কৃষক পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য নিম্নরূপ:
ডিলার পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য (টাকা/কেজি)
| ক্রমিক | সারের নাম /টিএসপি/ডিলার পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য/কেজি |
| ১ | ২৫ টাকা/কেজি |
| ২ | এমওপি ১৮ টাকা/কেজি |
| ৩ | ডিএপি ১৯ টাকা/কেজি |
কৃষক পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য (টাকা/কেজি)
| ১ | সারের নাম /টিএসপি | ২৭ টাকা /কেজি |
| ২ | এমওপি | ২০ |
| ৩ | ডিএপি | ২১ |
লক্ষ্মীপুর সদরের এক কৃষক বলেন, “সরকারিভাবে সার আছে বলে শুনি, কিন্তু আমাদের এলাকায় সময়মতো পাওয়া যায় না। অনেক সময় ডিলারের কাছে গিয়ে ফিরে আসতে হয়।” রামগতি ও কমলনগর এলাকার কয়েকজন কৃষকও অনুরূপ অভিযোগ করেছেন। তাদের মতে, মৌসুমের শুরুতে সারের চাহিদা বেড়ে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলায় সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে এবং নিয়মিত বিতরণ করা হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় হঠাৎ চাপ বাড়লে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।
সার সরবরাহে নজরদারির প্রয়োজনীয়তা
কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সার সময়মতো কৃষকের হাতে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সরকারি গুদামে কত সার রয়েছে তা নয়—পরিবহন, ডিলার পর্যায়ে বিতরণ এবং খুচরা বাজারে বিক্রির পরিস্থিতিও নজরদারির আওতায় রাখা প্রয়োজন। কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সার নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করলে বা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয় মজুতের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও দ্রুততর করা গেলে কৃষকদের আস্থা বাড়বে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রয় নিশ্চিত করা এবং ডিলার পর্যায়ে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
পেঁয়াজ সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগ
সারের পাশাপাশি পেঁয়াজের উৎপাদন ও সংরক্ষণ নিয়েও কথা বলেছেন কৃষিমন্ত্রী। দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণ বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি খাতের তথ্য অনুযায়ী, পেঁয়াজ উৎপাদন ভালো হওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল। সরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে এবং কৃষকদের আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
পেঁয়াজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনের পর পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। এ সমস্যা কমাতে এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
কৃষকদের করণীয় ও সরকারের দায়িত্ব
কৃষকদের উচিত:
সার কেনার সময় নির্ধারিত মূল্য ও রশিদ সংরক্ষণ করা
কোনো অনিয়ম দেখলে স্থানীয় কৃষি অফিস বা উপজেলা প্রশাসনকে জানানো
গুজব বা অযাচাইকৃত তথ্যে কান না দিয়ে সরকারি তথ্য যাচাই করা
সরকারের পক্ষ থেকেও মাঠ পর্যায়ের নজরদারি আরও জোরদার করা এবং ডিলার পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য লক্ষ্মীপুরে ৬৬০ মেট্রিক টন নন-ইউরিয়া সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো, এই সার সময়মতো এবং নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে পৌঁছায় কি না।
সব মিলিয়ে, কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্য এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বরাদ্দপত্র অনুযায়ী দেশে সারের মজুত রয়েছে। তবে জাতীয় বরাদ্দের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে সময়মতো ও নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করা গেলে কৃষকরা প্রকৃত সুফল পাবেন। সার সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা গেলে কৃষি উৎপাদন আরও বাড়বে এবং কৃষকদের ভোগান্তি কমবে।
প্রতিবেদক: খালিদ মাহমুদ
লক্ষ্মীপুর নিউজ
আরও খবর অফিসিয়াল ফেজবুক
https://www.facebook.com/share/18TAXm3NLN
যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে


